ইতনা টিভি
নিউজ বাংলাদেশ

শ্রমিকের হাটে বিক্রি হচ্ছে শিশুরা।

জেলা প্রতিনিধি নোয়াখালী।
নোয়াখালীর উপকূলীয় এলাকা সুবর্ণচরের হারিছ চৌধুরীর বাজার ওরফে আটকপালিয়া বাজারে ইরি-বোরো ধান কাটার মৌসুমে প্রতি শুক্র ও সোমবার বসে শ্রমিক বেচাকেনার হাট। এ শ্রমের বাজারে বড়দের সঙ্গে এখন শিশু শ্রমিকের বেচাকেনাও চলছে হরহামেশা। করোনাকালে অভাব-অনটনের সংসারে স্কুলের বই আর খেলার সামগ্রী রেখে এখন শিশুরাও বাধ্য হচ্ছে কাস্তে-কোদাল হাতে নিতে। আটকপালিয়া বাজারে শ্রমিক বিক্রির হাটে গিয়ে দেখা যায়, বড়দের সঙ্গে অসংখ্য শিশুও নিজের শ্রম বিক্রি করতে এসেছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছেন মহাজনদের কাছে বিক্রি হওয়ার অপেক্ষায়। এদের অনেকের পরনে রয়েছে প্রাইমারি স্কুলের পোশাক। তাদের হাতে রয়েছে রাতে ঘুমানোর জন্য কাঁথা, ধানকাটার কাঁস্তে ও কাপড়ের থলে। বিক্রি হতে আসা দরবেশ বাজারের শাহজাহানের ছেলে রাফি (১২) জানায়, বাড়িতে তার মা একা। সংসার চালাতে টাকার প্রয়োজন, অভাবে পেটের দায়ে সে কাজে এসেছে। বাড়িতে মাকে ফেলে মহাজনের বাড়িতে একা ঘুমাতে পারবে কি-না জিজ্ঞেস করতেই ফেলফেল দৃষ্টিতে মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দিল।

কাজের খোঁজে আটকপালিয়া বাজারে এসেছে কিশোর নঈম উদ্দিন (১৩)। সে লক্ষ্মীপুরের রামগতির গিয়াস উদ্দিনের ছেলে। বাবা-মায়ের সঙ্গে কাজ করেই শিশুকাল অতিবাহিত হচ্ছে তার। নাঈম পড়তে চেয়েছিল। কিন্তু সংসারের অসচ্ছলতা তাকে এগোতে দেয়নি। টাকার অভাবে বাবা-মায়ের কাছ থেকে তার ইচ্ছার বাস্তবায়ন ঘটেনি। আসতে হয়েছে কাজের হাটে।

কাজে আসার কারণ জিজ্ঞেস করতেই জানাল, বাবা অসুস্থ থাকায় কাজে আসতে হয়েছে।

চর মহিউদ্দিনের মৃত আবদুল খালেকের ছেলে জিয়াউর রহমান (১৪) পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। করোনার কারণে স্কুল বন্ধ, তাই পরিবারের আর্থিক অনটন ঘোচাতে জীবিকার সন্ধানে শ্রমিকের হাটে। সে জানায়, লেখাপড়া করে জীবনে বড় হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও সে স্বপ্ন এখন তার দুঃস্বপ্ন। গায়ে স্কুলের পোশাক পরিহিত সাইফুল (১০)। চর মহিউদ্দিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। মা বাবা বলছে কাজ করতে যাও। দুপুরে এসেছে বিকেল ঘনিয়ে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। মহাজনের সঙ্গে দর কষাকষিতে যাওয়া হয়নি। তার চাহিদা ৩৫০ টাকা আর দাম উঠেছে ২৫০ টাকা। এছাড়াও এসেছে চর আমান উল্যাহর হেদায়েতের ছেলে সুমন (১৭), চর মহিউদ্দিনের মো. আলীর ছেলে মো. রুবেল (১৫), আখতার হোসেন (১৭), দরবেশ বাজারের সৈয়দ মকবুলের ছেলে আ.হামিদসহ (৯) আরও অনেক শিশু শ্রমিক। এদের অনেকে জানায়, কাজে গাফিলতি করলে মজুরি কমে যায় কিংবা কাজ না পারলে চলে আসতে হয়। মহাজনদের বাড়িতে কাজে গিয়ে ভাত খেতে হয় ডাল, বেগুন, সবজি ছাড়াও ভিন্ন পদের তরকারি দিয়ে।

শ্রমবাজারের শিশু ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অভাব অনটনে কাজে যাওয়া শিশুদের মজুরি কম, খাটুনি বেশি। বর্তমান বাজারে দাবদাহের মধ্যে ইরি (বোরো) ধানকাটা ও রবিশস্য খামারের কাজে শিশুদের দৈনিক মজুরি ২৩০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা। মজুরি কখনো এর চেয়েও কমে যায়। মজুরি কম হলেও খাটুনি ঠিকই ১০-১২ ঘণ্টা, ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬-৭টা পর্যন্ত। সারাদিনে এক থেকে দেড় ঘণ্টার বিশ্রামের সময় পায়।

আটকপালিয়া হারিচ চৌধুরীর বাজার ছাড়াও এই উপজেলা আরও শ্রমিক বেচাকেনার হাট রয়েছে। এরমধ্যে চরবাটা খাসের হাট, পূর্ব চরবাটা ছমির হাট, চরক্লার্ক বাংলাবাজার, মোহাম্মদপুরের আক্তার মিয়ার হাট ও চরওয়াপদা থানাহাট এলাকায় সবচেয়ে বেশি মানুষ কাজের খোঁজে বিক্রি হতে আসেন। হাটের দিন নির্ধারিত জায়গায় রাস্তার ওপর থলে, কাঁচি আর আসবাবপত্র হাতে এদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়।

সুবর্ণচরের স্থানীয় সাংবাদিক আবদুল বারী বাবলু বলেন, ‘যে বয়সে লেখাপড়া আর খেলাধুলা করে মায়ের আঁচলের নিচে ঘুমানোর কথা। সেই বয়সে ওরা মহাজনের বাড়িতে ঘুমানোর সব প্রস্তুতি নিয়ে শ্রমের হাটে আসে। অন্যদিকে শিশু মজুরদের খাবার বা চিকিৎসার নিশ্চয়তা থাকে না। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিক শিশুরা মাঠে কাজের উদ্দ্যেশ্যে ছুটে যেতে হয়। মহাজনের ইচ্ছানুযায়ী কাজের তালিকায় থাকে ধান কাটা, রবি ফসলের ক্ষেত তৈরি, চারা রোপণ, পানি তোলা ছাড়াও নানা ধরনের কাজ। যা অনেক শিশুর জন্য অসাধ্য হয়ে ওঠে। সুবর্ণচরের শহীদ জয়নাল আবেদীন সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় ঠিকমতো অভিভাবক ছেলে মেয়েদের তদারকি করছে না। করোনার এই সময়ে অনেকে অপ্রাপ্ত বয়সে তার সন্তানকে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। কাজে যাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে তিনি বলেন, ‘অনেক অভিভাবক নিজেদের আর্থিক চাহিদা মেটাতে শিশুদের কাজে পাঠান।

Related posts

ভোট চলছে ৬২ পৌরসভায়

admin

শর্তসাপেক্ষে চলবে দূরপাল্লার বাস, লঞ্চ ও ট্রেন।

admin

হিলিতে আলুর দাম বেড়েছে কেজিতে ১০ টাকা

admin

Leave a Comment

Translate »