ইতনা টিভি
দুর্নিতি নিউজ

মেহেরপুরের ডিসি অফিসে কোটিপতি পিয়নরা।

টিনের ছাউনির ঘরে পরিবার নিয়ে বসবাস। অন্যের বাড়ি বা অফিসে ঝাড়ু দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা। হেঁটে কিংবা ভাঙা সাইকেল ঠেলে অফিস যাওয়া আসা। তিন বেলা অন্ন জোগানের খোঁজে হাড়ভাঙা পরিশ্রম ছিল তাদের নিত্যদিনের চিত্র। অথচ মাত্র এক যুগের ব্যবধানে তারাই আজ শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক। যাদের অর্থ, সম্পত্তি, বিত্ত নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে মুখরোচক নানা কাহিনী। যা ‘আলাদীনের চেরাগ’-এর গল্পকেও যেন হার মানায়। এরা আর কেউ নয়, মেহেরপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ৮-৯ জন পিয়ন। যারা ট্রেজারি শাখায় কাজ করে শতকোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। মূলত সরকারি স্ট্যাম্প-কোর্ট ফি জালিয়াতি, বিক্রি ও পাচার, রাজস্ব তছরুপ এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের নাম ভাঙিয়ে নিয়োগবাণিজ্য করে পিয়নদের এই চক্রটি অল্পদিনেই ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ হয়েছে।
মেহেরপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের পিয়নদের ওই সিন্ডিকেটের প্রধান পিয়ন থেকে নাজির হওয়া (সম্প্রতি ১৪ কোটি টাকার স্ট্যাম্প পাচার অভিযোগে বরখাস্ত) রফিকুল ইসলাম। দুর্নীতির মাধ্যমে তিনিসহ তার সিন্ডিকেটের সরকারি কর্মচারীদের শতকোটি টাকার মালিক হওয়ার বিভিন্ন মুখরোচক কাহিনীর ব্যাপক প্রচার রয়েছে এলাকায়। আর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা ক্ষমতাশালী জনপ্রতিনিধিদেরও ওই কর্মচারীদের দুর্নীতির টাকার ভাগ পাওয়ার কাহিনী প্রকাশ পায় কর্মকর্তা বদলি হলে কিংবা জনপ্রতিনিধি ক্ষমতা হারালে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্ট্যাম্প-কোর্ট ফি পাচার ও বিক্রি করে কোটিপতি হওয়া চক্রের প্রধান মেহেরপুর ডিসি অফিসের নাজির বা বড়বাবু (সম্প্রতি বরখাস্ত) রফিকুল ইসলাম ১০ বছরের বেশি সময় ধরে আছেন ট্রেজারির দায়িত্বে। এরমধ্যে এক বছর নাজির হিসেবে থাকলেও কোটি টাকা দিয়ে তদ্বির করে ফের ট্রেজারিতে তার যোগদানের আদেশ হয়েছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। আর ওই তদ্বিরে ডিসির চাইতেও ছিল বড় হাতের নির্দেশ। ডিসি অফিসের পিয়ন থেকে নাজির হওয়া এই রফিকুল ইসলাম এখন শতকোটি টাকার মালিক। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যানুযায়ী তার জন্ম ৮ আগস্ট ১৯৬২। শিক্ষাগত যোগ্যতা উচ্চ মাধ্যমিক। বাড়ি সদর উপজেলার আমঝুপি ইউনিয়নের খোকসা গ্রামে। এলাকায় বিএনপি নেতা বলে পরিচিত। দরিদ্র পিতা মীর মোকাদ্দেস আলীর সন্তান রফিকুল আমঝুপির রেশনিং ডিলার ফজলুল হকের বাড়িতে লজিং থাকতেন। সেখানে থেকে ৭/৮ ক্লাস পর্যন্ত পড়াশোনা। তারপর ডিসি অফিসে এমএলএসএস (পিয়ন) পদে চাকরি হলে ওই বাড়ির মেয়ে মাহফুজা খাতুনকে বিয়ে করেন। বৈবাহিক সূত্রে বিএনপি নেতার আত্মীয় হন। ডিসি অফিসে চাকরিকালে অফিসের পরিচ্ছন্নতাকর্মী তহমিনা খাতুনের সঙ্গে হয় সখ্য। এক পর্যায়ে তার কাছে হয়ে পড়েন ঋণগ্রস্ত। পরে ঋণমুক্ত হওয়ার শর্তে তহমিনাকে দ্বিতীয় বিয়ে করতে বাধ্য হন রফিকুল। তারপর রাজনৈতিক প্রভাবে ডিসি অফিসের ট্রেজারি শাখার দায়িত্ব নিয়ে বসেন। এখন মেহেরপুরে শহরে এবং গ্রামে রফিকুল ও তার স্ত্রী-পুত্রের নামে শতবিঘার বেশি জমি আছে। এছাড়াও বিশাল মৎস্য খামার, গরুর খামার, অত্যাধুনিক ইটভাটা, সিডস ফার্ম, চানাচুর ফ্যাক্টরি, বেসরকারি ব্যাংকের এজেন্সি, একাধিক পণ্যবাহী ভারী ট্রাক, মাইক্রোবাস এবং ঢাকার মিরপুর ও বাড্ডায় দুটি বাড়ি ছাড়াও মোট শতকোটি টাকার সম্পত্তি আছে তার। স্ট্যাম্প কেলেঙ্কারির ঘটনায় তিনি একাধিকবার আলোচনায় এসেছেন। তদন্ত হয়েছে। কিন্তু অর্থ আর প্রভাবে সব ধামাচাপা পড়ে যায়।
রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে রফিকুলের সম্পত্তির মালিক হওয়ার তথ্যানুসন্ধান করতে গিয়ে মিলেছে ভয়ংকর তথ্য। দলিল নং-৪৪২১, বালাম-১৩০, পাতা ১০৫-১১১, রেজিস্ট্রি তারিখ-২৫/০৭/১৭, জমি-২০ কাঠা। জমির সাবেক মালিক সাইফুল ইসলাম জানান, আমঝুপি চাঁদবিল মৌজায় প্রতিকাঠা জমির বর্তমান বাজার দর ৪-৫ লাখ টাকা। তিনি ওই জমিটি ৪৩ লাখ টাকায় রফিকুলের কাছে বিক্রি করেছেন। দলিল নং-৩৯০৩, বালাম-১৩৬, পাতা ১০৭-১১২, রেজিস্ট্রি তারিখ-২৫/০৫/১১, জমি-৭ শতক। শহরের সরকারি কলেজপাড়ায় এই জমিটির মূল্য রেজিস্ট্রি দলিলে ১ লাখ ২৫ টাকা দেখিয়েছেন রফিকুল। অথচ জমিটির দাতা ইমতিয়াজ হোসেন জানান, তিনি জমিটি ৩০ লাখ টাকায় রফিকুলের কাছে বিক্রি করেছেন। মেহেরপুর পৌরসভার প্যানেল মেয়র শাহিনুর রহমান রিটন জানান, শহরে প্রতি শতক জমির মূল্য ১০-১২ লাখ টাকা। রাজস্ব ফাঁকির এমন দৃষ্টান্ত শতাধিক দলিলে আছে। ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মূলত রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে কম মূল্যে জমি ক্রয় দেখিয়ে শত শত কোটি টাকা আড়াল করতে এই কৌশল বেছে নিয়েছেন রফিকুল। তার অবৈধ অর্থে অনেক নারী ও ব্যক্তির বহুতল বাড়ি ও গাড়িও হয়েছে। অথচ, ২০০৯ সালের আগে রফিকুলের কিছুই ছিল না।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রফিকুল ইসলামের দাবি, তিনি কষ্ট করে স্ত্রী-পুত্রদের নামে সম্পত্তি গড়ে দিয়েছেন। মানুষ ছোট থেকে বড় হতেই পারে। সব সম্পত্তি বৈধভাবে কেনা।
আর রফিকুলের বড় ছেলে মোস্তাক আহমেদ মিলন দাবি করেন, সম্পত্তির বেশিরভাগ তাদের দুই ভাইয়ের অর্থে কেনা। তিনি বেসরকারি একটি টেলিভিশনের ক্যামেরাপারসন ছিলেন। চার বছর আগে চাকরি ছেড়ে গ্রামে এসে উপার্জিত অর্থ দিয়ে সম্পত্তি গড়েছেন।
তিনি বলেন, ‘১২ বছর মিডিয়াতে চাকরি করেছি। কোটি টাকার সম্পত্তি, ব্যবসা থাকতেই পারে।’ তবে তার ছোট ভাই মোস্তাফিজুর রহমান দোলন বলেন, ‘সম্পত্তি ও অর্থের বিষয়ে বড় ভাই আর বাপ সব জানে। আমি কিছুই জানি না।’
রফিকুলের দ্বিতীয় স্ত্রী ডিসি অফিসের সাবেক পরিছন্নতাকর্মী স্বশিক্ষিত তহমিনা খাতুনও এখন শতকোটি টাকার মালিক। তিনি শহরেই থাকেন। রফিকুল তার চতুর্থ স্বামী। মেহেরপুর শহরে তারও কোটি টাকার একাধিক প্লট, বাড়ি, দোকান, সম্পত্তি, ক্লিনিক, বিস্কুট ফ্যাক্টরি, ইটভাটা ছাড়াও পাঁচশ’ ইজিবাইক রয়েছে। মালবাহী ১০ চাকার ভারী ট্রাক আছে ডজনখানেক। মেহেরপুরে সিটি ব্যাংকের প্রধান এজেন্ট শাখাসহ দুটি শাখার অংশীদার তিনি। নিজ অর্থে হতদরিদ্র ৩ ভাই, ৬ বোনকে অর্থ-সম্পত্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তহমিনা। এমন নাটকীয় উত্থান প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তহমিনা খাতুন অকপটে বলেন, ‘এক আইনজীবীর ঘর ঝাড়ু দিতে দিতে ডিসি অফিসে চাকরি। তারপর জীবনে সব ধরনের পরিশ্রম করে অর্থবিত্ত গড়েছি। কিছু ব্যবসা ভাইয়েরা দেখাশোনা করে। কিছু ব্যবসা সৎ ছেলে

Related posts

শ্রমিকের হাটে বিক্রি হচ্ছে শিশুরা।

admin

ফিলিস্তিনিদের জন্য পুরান ঢাকায় মানববন্ধন।

admin

কোচ ছাড়াই পাকিস্তান সফরে জিম্বাবুয়ে

admin

Leave a Comment

Translate »